- সাক্ষাতকার

‘সিন্ডিকেট-দুর্নীতি বন্ধ করব’

উচ্চ অভিবাসন ব্যয় কমানোই এখন আমার বড় চ্যালেঞ্জ। আমি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই অভিবাসন ব্যয় কিভাবে কমানো যায় সেটা নিয়ে কাজ করছি। মালয়েশিয়ার বাজার এখন বন্ধ, সেটি খোলার অপেক্ষায় আছে। আমার কাছে সিন্ডিকেটের কোনো জায়গা নেই। কম টাকায় মালয়েশিয়া কিংবা অন্য দেশে পাঠানোই আমার ভিশন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি একটি দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ এমন দৃঢ়তার কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন : রিক্রুটিং এজেন্সির সদস্যরা মালয়েশিয়ার বাজারে ৩৩ হাজার ৫৭৫ টাকায় কর্মী পাঠানো যৌক্তিক মনে করছেন না। আপনি কিভাবে দেখেন?’

মন্ত্রী ইমরান আহমদ : তাই বলে উনারা চার লাখ টাকায় মালয়েশিয়ায় পাঠাবেন! কোনোভাবেই এ রকম উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী যাবে না। আর খেলা তো এখানে (বাংলাদেশে) নয়, আসল খেলা তো মালয়েশিয়ায় হচ্ছে। ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট যেটা হয়েছে, তার সব তো মালয়েশিয়া থেকে হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ৩৩ হাজার ৫৭৫ টাকা। ওটা কার্যকর না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে বায়রার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একটি অঘোষিত সিদ্ধান্ত হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকার। এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সম্মতি থাকার কথা ছিল মালয়েশিয়া সরকারের। আমি যতটুকু জানি, মালয়েশিয়া সরকার সেটার বিষয়ে একমত হয়নি। কিন্তু মালয়েশিয়ায় বড় বড় রাঘব বোয়াল জড়িত, ওখানকার দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি চেষ্টায় আছি এসব অনিয়মের অবসান করার। মালয়েশিয়ার মুড পরিবর্তিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক নেই, মাহাথির মোহাম্মদের নতুন সরকার এসেছে। আবার দুই বছর পর আনোয়ার ইব্রাহিম আসবেন। আমরা বুঝেশুনে এবার এগোচ্ছি। আমাদের মাহাথির মোহাম্মদ আর আনোয়ার ইব্রাহিমের লাইনেই থাকতে হবে। এই সেক্টরের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের অ্যান্টিকরাপশন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে, নিশ্চয়ই একটি রিজনেবল সমঝোতায় আসবে। আমি কোনোভাবেই আর সিন্ডিকেট হতে দেব না। আমি সিন্ডিকেটের মানুষ নই, আমি ওটা কোনোভাবেই হতে দেব না।

প্রশ্ন : রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো রসিদ ছাড়াই কর্মীদের কাছ থেকে টাকা নেয়-আপনি জানেন কি না?

ইমরান আহমদ : আমি ইতিমধ্যে বায়রার মিটিংয়ে বলেছি, লেনদেন করলে রসিদ দিতে হবে। আর সারা দেশের উপজেলা লেভেলে আপনাদের অফিস দেওয়ার ব্যবস্থা করেন না কেন? মানুষ গ্রাম থেকে দালাল ধরে না এসে সরাসরি আপনাদের এজেন্সিতে চলে আসবে। জবাবে তারা বলল, এটা তো আমাদের অনুমতি নেই। ওই সময় উপস্থিত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলাম উপজেলা পর্যায়ে অফিস দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায় কি না?  সচিবও বললেন, এটার অনুমতি দেওয়া যায়। তখন আমি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের বললাম আপনারা আবেদন করুন, উপজেলা পর্যায়ে আপনারা অফিস করুন, আমরা অনুমতি দেব। ওরা সাব-এজেন্ট দিয়ে কাজ করায়, পরে প্রতারণার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। কেউ চার লাখ টাকায় বিদেশ যেতে চাইলে গ্রামের দালাল, মাঝের দালালসহ কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে আসে রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে। আর কোনো প্রতারণা হলে দালালদের চেনে না রিক্রুটিং এজেন্সির লোকজন। যদি উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে এজেন্সির অফিস থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ সরাসরি সেখানে গিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে টাকা লেনদেন করত। প্রতারণা হলে এজেন্সিকেও ধরা যেত। ধরুন, গ্রামের এজেন্ট, যাকে দালাল বলি আমরা, বিদেশে যেতে ইচ্ছুক পরিবারের কাছে অভিবাসন ব্যয়ের কথা জানাল চার লাখ টাকা। গ্রামের এজেন্ট চলে গেল জেলা পর্যায়ের এজেন্টের কাছে। সেখানে গিয়ে নিজের পকেটে কিছু রেখে তাকে দিল সাড়ে তিন লাখ টাকা, সেই জেলা পর্যায়ের এজেন্ট দিল ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্টকে আড়াই লাখ টাকা। এভাবে তিন-চারটি স্তরে টাকা দিতে হচ্ছে। মালয়েশিয়া ও বালাদেশের মিনিস্ট্রি ও বিএমইটিতে কেউ কেউ টাকা পাচ্ছেন। শ্রমিকের কাছ থেকে নেওয়া চার লাখের মধ্যে এক লাখ কিংবা তার কিছু বেশি টাকা মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেটের কাছে অগ্রিম দিতে হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি ভাগে টাকা দিতে হয়েছে। আবার আমাদের বাংলাদেশে কি দিতে হয়নি? মিনিস্ট্রি, বিএমইটিসহ বিভিন্ন সেক্টরেও টাকার ভাগ দিতে হয়। প্রবাসী কর্মীর টাকা পদে পদে লুটে খাচ্ছে সিন্ডিকেটের লোকজন। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যে বিশ্বাস নিয়ে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব এবং জনশক্তি সেক্টরের অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করে সেটা প্রমাণ করব।

প্রশ্ন : শ্রমিকের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার করা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হচ্ছে পদে পদে। কিন্তু সেটা কেউ দেখছে না। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্ট যাঁদের শ্রমিকদের স্বার্থ দেখার কথা তাঁরা সেটা দেখছেন না—এমন অভিযোগ নিশ্চয় আপনিও পেয়েছেন?

ইমরান আহমদ : ওরা দেখছে না এই কারণে যে ওরাও তো বাটে আছে (ভাগ পাচ্ছে); ওরা দেখবে কেন? পচন অনেক গভীরে চলে গেছে। আমি নতুন, মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দেশের লেবার কাউন্সিলরদের আমলনামা পর্যবেক্ষণ করছি। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্ন : এসব অনিয়ম আর দুর্নীতি বন্ধে আপনার কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা আছে কি?

মন্ত্রী ইমরান আহমদ : একটু অপেক্ষা করেন, আমি অল্প কয়েক দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। ধীরে ধীরে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সেক্টরের জঞ্জাল দূর করা হবে। একটু সময় দিন, আমরা যখন নতুনভাবে পুরো প্রসেস চালু করব তখনই পুরোপুরি বন্ধ হবে অনিয়ম আর দুর্নীতি। পুরনো নিয়মে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধ আছে, নতুন প্রক্রিয়ায় আশা করছি মালয়েশিয়ার বাজারে অনিয়ম করার সাহস পাবে না। সেই পথগুলো বন্ধ করে দেব। আমি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। আমি অতীতের দুর্নীতি নিয়ে হাঁটব না, আমি বর্তমান নিয়ে হাঁটব, সামনের দিকে তাকাব।

Please follow and like us:

About বি-বার্তা

Read All Posts By বি-বার্তা